দৈনিক নবতান
জনতার সংসদ

BREAKING NEWS

মধুপুরে গারো নারী শ্রমিকদের বেতন বৈষম্য, সংসারে হিমশিম

0

মধুপুর গড়ের থানার বাইদের মৃদুল নকরেক(৫০) ও থলেন নকরেক (৫৮)সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। তাদের সংসারে দুই ছেলে ও তিন মেয়ে। ছোট এক ছেলে ছাড়া সবাইকে বিয়ে দেয়ায় তারা আলাদা। অবস্থানগত কারণে তারা একে অপর থেকে দূরে। স্বামী-স্ত্রী মিলে এখন তাদের তিন সদস্যের সংসার।

সংসারের খরচের জন্য অন্যের কাজ করেন তারা দুজনেই। কিন্তু স্ত্রী মৃদুল স্বামীর সমান কাজ করেও বেতন পান স্বামী থলেনের চেয়ে ৫০ বা কোন কোন ক্ষেত্রে ১০০ টাকা কম। দিন চুক্তি হলে থলেন ৪০০ আর মৃদুল ৩৫০/৪০০ টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরেন। দ্রব্য মূল্যের আকাশ চুম্বিতে এ দিয়েই চলছে কোন রকম বেঁচে থাকা।

নির্মলা নকরেক। বয়স ৫৫ বছর। তার বাড়ি গারো পল্লীর মধুপুরের সাইনামারী গ্রামে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁচি, ছেনি, দা, কোদাল নিয়ে পুরুষের মতো কাজের সন্ধানে বের হন তিনি। একই সাথে পুরুষও কাজ করেন। সমান কাজ কললেও মজুরিতে বেশ বৈষম্য। শুধু মৃদুল, নির্মলা নয় প্রেনিতা নকরেক(৪৫), লাবনী চিরান(৩০), সোমা মৃ(৪৫), রাজঘাটি গ্রামের চন্দ্রা নকরেক(৫০), ববিতা নকরেক(৩৫), সেলিনা দালবত(৪৮) সবার বেলায় প্রায় একই গল্প।

মধুপুর উপজেলার চানপুর রাবার বাগান এলাকার বাসিন্দা এসব গারো নারী। সম্প্রতি তাদের সাথে একান্তে কথা বলার সময় উঠে আসে তাদের নানা সুখ দুঃখের কাহিনী।

তাদের জানান, মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় গারো নারীরাই সংসারের প্রধান বলে প্রধান কাজগুলো তারাই করেন। ঘরে বাইরের সব কাজে তাদের পদ চারণা। কৃষি কাজে ব্যাপক শ্রম ঘাম দিয়ে থাকেন। সমানতালে পুরুষের সাথে কাজ করেন। ধান কাটা, চারা রোপন, জমি নিড়ানী, ফসলকাটা, কলা বাগানের পরিচর্যা, হলুদ- আদা উত্তোলন, আনারস বাগানে কাজসহ গৃহস্থালির নানা কাজে তাদের উপস্থিতি। বেতন বৈষম্যের ব্যাপারে নির্মলা জানান, তারা নারী বলে তাদের বেতন কম। কাজ সমান করলেও বেতন সমান দেওয়া হয় না। স্বামী, ২ ছেলে ও মেয়ে নিয়ে লোপিয়া ম্রং(৩৫)’র সংসার। তিনি মজুরি ভিত্তিতে মাঠে দিন মজুরের কাজ করেন।

তার মজুরি দৈনিক ২৫০/৩০০ টাকা। স্বামীর মজুরি ৪০০/৪৫০ টাকা। ২জনে যে মজুরি পান তা দিয়ে কোন রকম সংসার চলে। অভাবের সংসার বলে নিত্যদিন কাজ করতে হয়। কাজ না করলে খাদ্যের যোগান হয় না। নারীর হওয়ার কারণে মজুরি বৈষ্যম্য তিনি মেনে নিয়েছেন। ক্ষেতের মালিকগণ নারী হওয়ার কারণে মজুরি কমের কথা স্বীকার করেছেন।

পীরগাছা কোচ পল্লীর সুমিত্রা রাণী কোচ(৪৮) ধানের জমিতে নিড়ানীর কাজের ফাঁকে বলেন, অন্যের কাজ করি। স্বামী-স্ত্রী ২জনে মিলে কাজ করে চাল, ডাল ও তেলসহ নিত্যপণ্যের উর্ধ্ব মূল্যের বাজারে তাদের হিমশিম খেতে হয়। রূপালী রাণী(৪০) জানালেন, ছেলে মেয়েদের যাতে এ কাজ না করতে হয় সে জন্য পড়াশোনায় দিয়েছেন। শত কষ্টে প্রতিদিন মাঠে ছুটেন কাজের সন্ধানে। মজুরি ছাড়া যখন চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করেন তখন তারা পুরুষের সমান মজুরি পান। তবে চুক্তি কাজে সুযোগ কম। ফলে তাদের দৈনিক মজুরিতে কাজ করতে হয়।

উল্লেখ্য, মধুপুর গড় এলাকা চাপাইদ, সাইনামারী, নয়নপুর, কোনাবাড়ি, ধরাটি, মমিনপুর, দোখলা, পীরগাছা, বেদুরিয়া, কাকড়াগুনি, জালাবাদা, জয়নাগাছা, গায়রা, জাঙ্গালিয়া, বেরিবাইদ, মাগন্তিনগর, গেৎচুয়া, টেলকিসহ প্রায় ৫০টি গ্রামে নৃ-গোষ্ঠির গারো কোচ নারীগণ কৃষি কাজে দিন মজুরের কাজ করে থাকেন।

মজুরি কম পাওয়ার অপ্রকাশ কষ্টের মধ্যেও জীবন জীবিকার জন্য কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙ্গা শ্রম দিয়ে এলাকার কৃষিকে তারা অনন্য করে তুলছেন। কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য বদলালেও তাদের কোন ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না। গুছিয়ে না বলতে পারলেও তাদের অব্যক্ত আকাক্সক্ষা শ্রমকে মূল্যায়ন ও তার ন্যায্য মজুরি পাওয়ার। বৈষম্যের কারণে তারা সামাজিক মর্যাদাও কম পাচ্ছেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদসহ নয়টি অনুচ্ছেদে নারী পুরুষের সমান অধিকারের সুস্পষ্ট বিধান থাকলেও মানা হয় না।

অথচ ১৮৫৭ সালে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘন্টা নির্ধারণসহ এসব দূর করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সূতাকলের নারী শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে এসে ছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯১০ সালের ৮ মার্চে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত নারী সম্মেলনে উত্থাপিত দাবির পথ ধরে ১৯৭৫ সাল থেকে বিশ্বে আজকের দিনটি বিশ্ব নারী দিবস। আজ নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.