দৈনিক নবতান
জনতার সংসদ

‘কাজ শেষ আমাকে বাঁচায়েন’ ৬ লাখ টাকার চুক্তিতে গোপালপুরের নিক্সনকে খুন করা হয়

0
টাঙ্গাইলে আ.লীগ নেতা নিক্সনের ঘাতকের খুদেবার্তা

‘কাজ শেষ আমাকে বাঁচায়েন’

৬ লাখ টাকার চুক্তিতে নিক্সনকে খুন করা হয় * মৃত্যু নিশ্চিত করে সংসদ-সদস্য ছোট মনির ও তার পিএস মাসুদকে অবহিত করে ঘাতক * আসামির স্বীকারোক্তিতে হত্যা পরিকল্পনার তথ্য

আমি আপনাদের জন্য কাজ করেছি। কাজ শেষ। আমাকে বাঁচায়েন।’-এটা কোনো সুপারহিট বাংলা নাটক বা সিনেমার সংলাপ নয়। টাঙ্গাইলের আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল ইসলাম নিক্সনকে হত্যার পর ঘাতক সুমনের নয় শব্দের একটি খুদেবার্তা।

 

 মাহবুব আলম লাবলু, টাঙ্গাইল থেকে ফিরে 

টাঙ্গাইলের আলোচিত সংসদ-সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনির, তার পিএস মির্জা আসিফ মাসুদ ও জনৈক কাদের চেয়ারম্যানের কাছে সুমন এই বার্তা পাঠায়। কিলিং মিশনে সরাসরি অংশ নেওয়া সুমন গ্রেফতারের পর আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে চাঞ্চল্যকর ও স্পর্শকাতর এই তথ্য ফাঁস করেছে। মামলার তদন্ত করে থানা ও ডিবি পুলিশ আদালতে যে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে তার কপিসহ পুরো ‘ডকেট’ ঘেঁটে জানা গেছে এ তথ্য।

 

 

ডকেটের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা গেছে, রাজনৈতিক কারণেই নিক্সনকে খুনের পরিকল্পনা করা হয়। ছয় লাখ টাকার চুক্তিতে কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করে প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ ভাড়াটে খুনি চক্র।

 

 

প্রসঙ্গত, কিশোরী ধর্ষণকাণ্ডে টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি গোলাম কিবরিয়া বড় মনি’র বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার পর দুই সহদোরের অপকর্ম সম্পর্কে এলাকার মানুষ মুখ খুলতে শুরু করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় নিক্সন হত্যা মামলায় চেপে রাখা চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য সামনে আসছে। হত্যাকাণ্ডটি ২০২০ সালে ঘটলেও স্থানীয় জনগন মনে করছে বিষয়টি এখনো প্রাসঙ্গিক। তারা যে কত ধরনের অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে এটা তার বড় প্রমাণ। প্রমাণ থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হয় না। যে কারণে তাদের অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলেছে। মুক্তিযোদ্ধা ফারুক হত্যা মামলায় জড়িয়ে টাঙ্গাইলের আরেক আলোচিত পরিবারের দুই ভাই গ্রেফতার হওয়ার পর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে দুই সহোদর বড় মনি ও ছোট মনির।

 

 

নিক্সন হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ঘাতক সুমনের পাঠানো ছোট এই খুদেবার্তা হত্যা পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক আছে তার ইঙ্গিত করে। এই খুদেবার্তার সূত্র ধরে সুষ্ঠু তদন্ত হলে পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করে হুকুমের আসামি করা যাবে। একটি তদন্ত সংস্থায় কর্মরত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এই জবানবন্দি ও নথি দেখেন। নথি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ‘যাদের কাছে খুদেবার্তা পৌঁছেছে তারা যে খুনের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কিন্তু সন্দেহের তির সংসদ-সদস্যের দিকে থাকায় হয়তো তদন্ত সেদিকে এগোতে পারেনি। যদি সাধারণ কোনো মানুষের সম্পর্কে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে এমন তথ্য আসত তাহলে অবশ্যই তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করা হতো।’ এ প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য সংসদ-সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনিরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এ প্রতিবেদক মঙ্গলবার দিনভর চেষ্টা করেন। কিন্তু তিনি ফোন ধরে কথা বলেননি। তার মোবাইল ফোনের অ্যাপসে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠানো হলে, তিনি তা দেখলেও জবাব দেননি। এরপর থেকে রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত দফায় দফায় ফোন দিলেও তিনি সাড়া দেননি।

 

 

চার্জশিট ও আসামিদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী থানা ও জেলা ডিবি পুলিশ তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে। কিন্তু তাতে আসামিদের জবানবন্দিতে বেরিয়ে আসা স্পর্শকাতর অনেক তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। খুনের পরিকল্পনাকারী হিসাবে আসামিরা জবানবন্দিতে যাদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন তাও উদঘাটন করেননি তদন্ত কর্মকর্তা। ফলে চার্জশিট প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি দেন মামলার বাদী নিহত নিক্সনের ভাই কলেজ শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন। বর্তমানে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলার অধিকতর তদন্ত করছে।

 

 

জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা সাব ইন্সপেক্টর আলমগীর হোসেন বলেন, ‘২ মাস ধরে আমি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছি। বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব না থাকায় আদালত পুনঃতদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পিবিআই বিষয়টি তদন্ত করছে। এখন সব দিক বিবেচনায় রেখে এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করা হবে। তদন্তে নতুন কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে অবশ্যই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।’

জানতে চাইলে মামলার বাদী আব্দুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, ‘গোপালপুরে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা আছে। হত্যাকাণ্ডের খবর জানিয়ে খুনি নিজেকে রক্ষার জন্য এমপি সাহেবকে কেন এসএমএস করবে? এই প্রশ্নের জবাব পেলে আমার ভাইয়ের আসল খুনিরা শনাক্ত হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আসামিদের স্বীকারোক্তিতে যাদের নাম এসেছে তারা সবাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। এখন টাঙ্গাইল নিয়ন্ত্রণ করেন এমপি ছোট মনির। তাদের ক্ষমতার প্রভাবে সঠিক তদন্ত হচ্ছে না বলে আমি বিচার পাচ্ছি না। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পুরো ঘটনা জানিয়েছি। তিনি সুষ্ঠু তদন্তের জন্য মামলাটি পিবিআইয়ের কাছে দিতে চান। যেদিন আমি মন্ত্রীর ওখান থেকে আসি পরদিনই পুলিশ আমাকে না জানিয়ে তড়িঘড়ি মামলার চার্জশিট দেয়। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিত করেছি। তিনি সব জেনে আমার ভাবীকে হাদিরা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেন। ভাবী এখন চেয়ারম্যান। কিন্তু ভাই হত্যার বিচার না পাওয়ার কষ্টের কথা তো বারবার প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারি না। তার পরও আমি হাল ছাড়িনি।’

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ৯টার দিকে খুন হন গোপালপুরের হাদিরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম তালুকদার নিক্সন। তিনি সংসদ-সদস্য তানভীর হাসান ছোট মনিরের নির্বাচনি এলাকার বাসিন্দা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার কারণে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই আব্দুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে পাঁচজনকে আসামি করে ধনবাড়ী থানায় মামলা করেন।

এই মামলার তদন্ত শেষে থানায় অভিযোগপত্র দেয় ধনবাড়ী থানা পুলিশ। কিন্তু ওই অভিযোগপত্র প্রত্যাখ্যান করে বাদীর নারাজির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত জেলা ডিবি পুলিশকে মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। পুনঃতদন্ত শেষে গত বছরের ৩০ এপ্রিল আটজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক হেলাল উদ্দিন।

 

 

অভিযুক্তদের মধ্যে আছেন এজাহারভুক্ত আসামি সুমন মিয়া, হাফিজুর রহমান, সুজন মিয়া, মো. ফারুক ও আজিজুর রহমান ওরফে আজিজ ইঞ্জিনিয়ার। এছাড়া তদন্তে পাওয়া আসামি সবুজ, মজনু মিয়া ও কামরুল হাসানের নাম অভিযোগপত্রে যুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আসামি আজিজ ইঞ্জিনিয়ার নিক্সনকে খুনের জন্য ঘাতকদের সঙ্গে ছয় লাখ টাকার চুক্তি করে।

 

 

আজিজ তার বিশ্বস্ত অনুসারী সবুজকে সুমনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নিযুক্ত করে। অভিযোগপত্রের এক প্যারায় বলা হয়েছে, তদন্তকালে অত্র মামলার এজাহারনামীয় গ্রেফতার করা আসামি মো. সুমনের ব্যবহৃত মোবাইল (নম্বর ০১৭৬৬৭৫৯৮৫০) থেকে হত্যাকাণ্ডের পরই বিভিন্ন মোবাইল নম্বরে পাঠানো ক্ষুদেবার্তা, তার জবানবন্দি ও সিডিআর পর্যালোচনা করা হয়েছে।

 

 

তাতে দেখা গেছে, খুনের ঘটনার পরই সুমন আজিজ ইঞ্জিনিয়ারকে ফোন করে। কিন্তু আজিজ কল রিসিভ না করে ফোন বন্ধ করে দেয়। এরপর সুমন নিজেকে বাঁচাতে একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তির মোবাইল ফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠায় বলে তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে কোন কোন রাজনৈতিক নেতার মোবাইলে সুমন খুদেবার্তা পাঠিয়েছিল তা অভিযোগপত্রে সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। ফলে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছেন।

 

 

মামলার ডকেট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ঘাতক সুমন যেসব রাজনৈতিক নেতার কাছে খুদেবার্তা পাঠিয়েছিল তাদের নামও প্রকাশ করেছে।

 

 

জবানবন্দির ৬ নম্বর পাতায় সুমন বলেছে, ‘আমি আজিজুর ইঞ্জিনিয়ারের শেল্টারে এলাকায় এমপি ছোট মনিরের ক্যাডার হিসাবে পরিচিত ছিলাম। আজিজ আমাকে ফোন করে নিক্সনকে প্রাণে শেষ করে দেওয়ার কথা বলে। টাকা পয়সা, থানা, কোর্ট-কাচারি সে আর বড় ভাই দেখবে বলে জানায়। জবানবন্দির ১১ পাতায় সুমন বলেছে, ‘হত্যাকাণ্ডের পর মোটরসাইকেলযোগে আমি পোড়াবাড়ি গিয়ে আজিজ ইঞ্জিনিয়ারকে ফোন দেই। সে ফোন রিসিভ করেনি। পরে ম্যাসেজ দেই, কাজ শেষ। কিন্তু কোনো রিপ্লাই দেয়নি।

 

 

‘আমি আপনাদের জন্য কাজ করেছি। কাজ শেষ। আমাকে বাঁচায়েন।’-এই ম্যাসেজ লিখে কাদের চেয়ারম্যান, এমপি ছোট মনির এবং তার পিএস মাসুদকে পাঠাই। এরপর ঈদের দিন আমি এমপি ছোট মনির সাহেবের বাড়িতে আসি। তিনি বাড়ির সামনে মাংস বণ্টন করছিলেন। আমাকে দেখে তিনি চমকে ওঠেন। আমাকে সেখানে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করলে আমি এক পাশে গিয়ে তাকে বলি যে, আমি আজিজের হুকুমে নিক্সনকে খুন করেছি। তিনি আমাকে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বলেন।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আজিজ ইঞ্জিনিয়ার এমপি ছোট মনির খুবই ঘনিষ্ঠ। এখনো আজিজের মাধ্যমে এমপির কাছে ঠিকাদারি কাজের কমিশন পৌঁচ্ছায় বলে অভিযোগ আছে।

 

 

আসামি সুজন মিয়াও তার জবানবন্দিতে বলেছে, ‘সুমন তার মোবাইল থেকে আজিজ ইঞ্জিনিয়ার, কাদের তালুকদার ও ছোট মনিরকে মেসেজ দিয়ে জানায় যে, নির্দেশ মোতাবেক সে নিক্সনকে মেরেছে। তাদের কাছে সে নিরাপত্তাসহ পরবর্তী সহায়তা চায়। জনৈক কাদের চেয়ারম্যানের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তার পুরো নাম আব্দুল কাদের তালুকদার। তিনি হাদিরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। দেড় বছর আগে তিনি মারা গেছেন।

 

 

আসামিরা জবাববন্দিতে এসব বিষয় স্পষ্ট করলেও তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে এদের নাম এড়িয়ে ‘কয়েকজন রাজনৈতিক’ নেতার সঙ্গে সুমনের যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযোগপত্র প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক মো. হেলাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি যাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ পেয়েছি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য স্বারক তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেই। তাদের অনুমোদন সাপেক্ষেই চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে।’ জবানবন্দিতে এমপি ছোট মনির, তার পিএস মাসুদ ও কাদের চেয়ারম্যানের নাম আসার পরও চার্জশিটে তাদের নাম গোপন করে যাওয়ার কারণ কি-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘তাদের এসএমএস দিয়ে খুনের কথা জানিয়েছে তাকে সেভ করার কথা বলেছে এটা ঠিক। কিন্তু ছোট মনির তাকে সহায়তা না করে উল্টো ধরিয়ে দিয়েছে। তাই তাকে দায়ী বলা যায় না।’

সূত্র দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা ১২ এপ্রিল ২০২৩, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

Leave A Reply

Your email address will not be published.