দৈনিক নবতান
জনতার সংসদ

BREAKING NEWS

বান্দরবানে কুকিচীন সন্ত্রাসী দমনে দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তা ক‍্যাম্প স্থাপনের দাবী

0
সাইফুল ইসলাম: বান্দরবান জেলা প্রতিনিধি:
পার্বত্য ভূখণ্ড প্রিয় বান্দরবানের নয়নাভিরাম নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে  ভয়ংকর এক সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বসবাস। যারা ডাকাতি, চাঁদাবাজি খুন ধর্ষণ অপহরণ এর মতো কাজগুলো করে যাচ্ছে প্রকাশ্য দিবালোকে। নিরব এই পাহাড়কে করেছে অস্থিতিশীল। যাদের কাছে আজ নিরবে জিম্মি হয়ে আছে এই পাহাড়ে বসবাসকারী সহজ সরল নিরীহ  মানুষগুলো। এই অস্থিরতা নিয়ে সম্প্রতি যে দলটি প্রকাশ্যে এসেছে তা হল কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ। বাংলাদেশ সরকার তাদেরকে চিহ্নিত করেছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আঞ্চলিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে।
বান্দরবানে কুকি চিন সন্ত্রাসীরা রক্তের খেলায় লিপ্ত। তারা সেনাসদস্য  হত্যা, সাধারণ মানুষ হত্যা, অপহরণ, খুন, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে বান্দরবানের পাহাড়ি বাঙ্গালী  জনগণের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট করা।
বান্দরবানের রুমা উপজেলার জারুলছড়ি পাড়ার কাছে কুকি চিন সন্ত্রাসীদের ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসের (আইইডি) বিস্ফোরণে দুই সেনা কর্মকর্তা আহত হয়েছেন এবং দুই জন নিহত হয়। একদিকে এই সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর টহল দলের উপর হামলা চালাচ্ছে, আবার কখনও অর্থের জন্য পাহাড়ি জনগণকে অপহরণ করছে। এই ভয়ে অনেক বাঙালী ও পাহাড়ি তাদের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত এসব চললেও কেউই তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পাচ্ছে না।
এর আগেও এপ্রিলে বান্দরবানে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে আটজন নিহত হন। এই সংঘর্ষে কুকি-চিনের নাম উঠে আসে। কেএনএফ অবশ্য ‘ভা তে কুকি’ নামে একটিক ফেসবুক আইডিতে নিহতদের এনআইডি কার্ড পোস্ট করেছে এবং দাবি করেছে যে তাদের সাত সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে। কুকি-চিন সন্ত্রাসীদের কারণে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ চরম বিপাকে পড়েছে। এই সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিয়েছে। বান্দরবানের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ধারণা এই কুকি-চিন সন্ত্রাসীদের কারণে বর্তমানে পাহাড়ের শান্তি সম্প্রীতি ও উন্নয়ন কাজ থমকে গেছে। এছাড়া তাদের কারণে বন্ধ রয়েছে পাহাড়ে পর্যটকদের আসা-যাওয়া, যার ফলে কমে গেছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। থমকে আছে স্থানীয়দের জীবীকা নির্বাহের উপায়। সব মিলিয়ে কুকি-চিনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে থমকে গেছে জন-জীবন।
কুকি-চিন সন্ত্রাসীদের এই নৃশংসতার কারণে বান্দরবান সদর উপজেলায় প্রায় ৪০০ পাহাড়ি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয় শিবিরে চলে গেছে। কুকি-চীন সন্ত্রাসীরা বম সম্প্রদায়ের হলেও তারা তাদের সম্প্রদায়ের মানুষকেও ছাড়ছে না। এবং তারা শুধু নিজেরাই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে না, তারা জামাআতুল আনসার ফিল হিন্দাল শরকিয়া নামে জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদেরকে ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে অর্থের বিনিময়ে।
তাই স্থানীয়রা বলছেন, পাহাড়টিকে বাঁচাতে হলে সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে কুকি-চিনের বিরুদ্ধে আরও জোরালো অবস্থান নেওয়া দরকার। তাদের এখন শক্ত হাতে দমন করতে হবে। তা না হলে পাহাড়ের অবস্থা আরও খারাপ হবে। পাহাড় হয়তো থাকবে পাহাড়ের জায়গায়, থাকবেনা পাহাড়ে বসবাসরত এই মানুষগুলো।
বান্দরবানের স্থানীয় নেতৃবৃন্দের অভিমত কুকি-চিন সন্ত্রাসীদের কারণে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছে। এই সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের শান্তি ও সুখ কেড়ে নিয়েছে। কুকি-চিন সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও জিম্মি করার কারণে পাহাড়ে বর্তমানে কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড চালানো যাচ্ছে না। কুকি-চিন সন্ত্রাসীদের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক পাহাড়ি গ্রামে মানুষ বসবাস করতে পারছে না। তারা পাহাড়ি গ্রামের সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অপহরণ করছে, চাঁদা দাবি করছে। যারা তাদের কথা শোনে না বা যারা চাঁদা দেয় না তারা নির্যাতিত হয়। ফলে পাহাড়ি গ্রামের সাধারণ মানুষ শহরের দিকে ঝুঁকছে। গ্রামগুলোর অবস্থা এমন যে, একটি গ্রামে ৬০টি পরিবার থাকার কথা, সেখানে এখন মাত্র ১০ থেকে ১৫ বা সর্বোচ্চ ২০টি পরিবার। বাকি পরিবারগুলো প্রাণ বাঁচাতে শহরের দিকে অনিশ্চিত পাড়ি জমাচ্ছে।
বতর্মানে সেনাবাহিনী এই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে। পাহাড়ে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অবিরত কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
আমি যতদূর জানি, পাহাড়ে কেউ কুকি-চিন সমর্থন করে না। এই সংগঠনের কারণে বান্দরবানবাসী এখন বিপদে আছে। বান্দরবান জেলার সমাজসেবক ও মানবাধিকার কর্মী এম রুহুল আমিন। তিনি আরও বলেন, শান্তিপ্রিয় বান্দরবান এখন আর আগের মতো শান্তিপূর্ণ নয়। এই কুকি-চিন সন্ত্রাসীরা বান্দরবানে উন্নয়ন,শান্তি, শৃংখলা ব্যাহত করছে। তাদের ভয়ে পাহাড়ে রাস্তাঘাটও উন্নয়ন করা যাচ্ছে না। কুকি-চীনের সদস্যরা বান্দরবানের পাশাপাশি পাহাড়ে নিয়মিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। মানুষ অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি। এই সন্ত্রাসী সংগঠন টাকা না দিলে কাউকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। কুকি-চিন ছাড়ছে না ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুকি-চিনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এতটাই বেড়েছে যে স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। তারা ছোট বা বড় কোনো ব্যবসায়ীকে বাদ দিচ্ছে না। টাকা না দিলে ব্যবসায়ীদের অপহরণ ও হত্যার হুমকি দিচ্ছে সন্ত্রাসী সংগঠন।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের সভাপতি কাজী মুজিবুর রহমান কুকি চিন সন্ত্রাসীদের বিষয়ে বলেন, কুকি চিন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি উপজেলায় যাতায়াত বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ কাজ করছে। কুকি-চিনের ভয়ে পালিয়ে আসা পাহাড়িদের খাবার ও চিকিৎসা সেবা দিয়েছে সেনাবাহিনী। বর্তমানে কুকি-চীন সন্ত্রাসী তৎপরতা চলছে। আবার কখনো কখনো জেএসএস, ইউপিডিএফসহ পাহাড়ি এলাকার কয়েকটি সংগঠন পাহাড়কে অশান্ত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। তাদের দমনে পাহাড়ে সেনাবাহিনীর বিকল্প নেই। পাহাড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনা সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। সেনাবাহিনী ছাড়া পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর পক্ষে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব নয়। পাহাড়ে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনীর আরও ক্যাম্প দরকার।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কেএনএফ প্রধান নাথান বম এবং এই সংগঠনের শীর্ষ নেতারা মিজোরাম ও মায়ানমার সীমান্তে অবস্থান করছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার সুযোগ নিয়ে তারা দ্রুত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। এটাও জানা যায় যে নাথান বম তার বেশিরভাগ সময় মিজোরামে কাটান।
র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত কুকি-চিনের ১৭ সদস্যকে আটক করেছে তারা। সংগঠনটির বিরুদ্ধে কড়া গোয়েন্দা নজরদারি রেখেছে র‌্যাব।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন ঢাকা পোস্টকে বলেন, র‌্যাব প্রথমে শারকিয়া পাহাড়ে জামায়াতুল আনসার ফিল হিন্দালের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অভিযান চালায় এবং তাদের সঙ্গে কুকি চিন সন্ত্রাসীদের যোগসাজশ খুঁজে পায়। পরে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। আমরা কুকি চিন সন্ত্রাসীদের অনেককে বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছি। মূলত তখন থেকেই র‌্যাবের অভিযান চললে প্রমাণিত হয় কুকি-চীনা সন্ত্রাসীরা রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এর পরিপ্রেক্ষিতে কুকি-চিন সন্ত্রাসীদের অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। যেহেতু তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের নিম্নভূমিতে অবস্থিত, তাই পাহাড়ের চূড়ায় যাওয়া বা অভিযান পরিচালনা করা খুবই কঠিন। তবে, বিভিন্ন বাহিনীর সাথে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে এবং অনেক কুকি-চিন সন্ত্রাসীকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে কুকি-ছিন সন্ত্রাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারীদের জিম্মি করা, টাকা দাবি করা, হামলাসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে আমরা এই সন্ত্রাসীদের বিচারের আওতায় আনতে গোয়েন্দা সংস্থা এবং অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে কাজ করছি।
KNF এর লোগো ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠার তারিখ দেখায়, কিন্তু ২০১৮ সালে সংগঠনটির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সবার নজরে আসে। তবে গত বছরের মাঝামাঝি থেকে পাহাড়ে সংগঠনটির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যায়। এরপর থেকে সংগঠনটির বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনটি পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক এলাকা জুড়ে অবৈধ ও বানোয়াট মানচিত্র তৈরি করেছে। তাদের কাল্পনিক মানচিত্রের তিন দিকে বাংলাদেশ, মায়ানমার ও ভারতের সীমান্ত রয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা ও মানবাধিকার কর্মী এম রুহুল আমিন জানান কেএনএফ সহ অন‍্যান‍্য বিদ্রোহী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের দমনে অবিলম্বে রুমা উপজেলা থানচি উপজেলা রোয়াংছড়ি উপজেলা ও লামা উপজেলার দূর্ঘম পাহাড়ি এলাকায় সেনাবাহিনী,বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশের নিরাপত্তা ক‍্যাম্প স্হাপন সহ সক্ষমতা বৃদ্ধি করার জন্য মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর জরুরী হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তিনি দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের কাছে আর কত রক্ত,জীবনও মায়ের বুক খালী  করবেন। পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের আর সুযোগ দেওয়া  ভূল হবে। এখনই সময় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের দমনের।
Leave A Reply

Your email address will not be published.