দৈনিক নবতান
জনতার সংসদ

BREAKING NEWS

‘সাংবাদিক কেন গুলিতে প্রাণ হারালো, বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়ব না’

0

অনলাইন ডেস্ক

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ঢাকা টাইমসের সাংবাদিক হাসান মেহেদী গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের বিচার চেয়েছেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ। সাংবাদিকদের কী অপরাধ, তারা কেন গুলিতে প্রাণ হারালো প্রশ্ন রেখে তারা বলেছেন, সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত, অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সাংবাদিকদের এক বিক্ষোভ সমাবেশে এসব কথা বলেন তারা।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা নির্যাতনের প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশ।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা নির্যাতনের প্রতিবাদে এই বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) একাংশ।

এতে সভাপতিত্ব করেন বিএফইউজে সভাপতি রুহুল আমিন গাজী।

সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিন আগে দেখলাম প্রধানমন্ত্রী এক বক্তব্য দিয়ে দেশকে উস্কে দিলেন। তার সাধারণ সম্পাদক বললেন, আন্দোলন কারীদের দমন করতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। এরপর কারফিউ জারির পর তিনি বললেন, কারফিউ মানেই দেখামাত্র গুলি। তিনি গুলি ছাড়া কিছু বুঝেন না।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখলাম দুজন পুলিশ কর্মকর্তা এমনভাবে বক্তব্য রাখলেন, তারা যে সরকারি কর্মকর্তা তারা ভুলে গেছেন। অতীতে কোনো পুলিশ প্রধানকে এমনভাবে বক্তব্য দিতে দেখিনি। এই পুলিশ শুধু আওয়ামী লীগ না দেশের সবার ট্যাক্সের টাকায় চলে। যতদিন পুলিশ দলীয় থাকবে ততদিন আন্দোলন থামানো যাবে না।’

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাদের চারজন সহকর্মী তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চিরুনি অভিযান চালাচ্ছেন। কিন্তু যেসব সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এই ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেই। হাসপাতালে মেহেদীর লাশ দেখেছি, এই গুলি কারা ব্যবহার করে আমরা জানি৷ তারা হত্যা করেছে এজন্য তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে সরকারদলীয় লোকজনের কোনো বক্তব্য নেই। এটি আমাদের দুর্বলতা। আমরা ঐক্যবদ্ধ না থাকায় আমরা বিচার পাই না।’

ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, ‘নয়াদিগন্তের সাংবাদিক তুরাব আলীর শরীরে ৯৮টা বুলেটের দাগ পাওয়া গেছে, মেহেদীকে পুলিশ গুলি করেছে। মেহেদী ফ্লাইওভারের ওপরে সংবাদ সংগ্রহ করছিল। সেখান থেকে নিচে আরেক সাংবাদিককে সে চিরকুট লিখেছিল, ‘উপরে একটা লাশ পড়ে আছে’। এর ১০ মিনিটের মধ্যে মেহেদীকে গুলি করে মারা হয়।’

সিনিয়র সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কাগজী বলেন, ‘যারা নিহত হয়েছে তাদের অভিভাবক হিসেবে আমরা ঘরে বসে থাকতে পারি না। যতদিন সরকারের পেটুয়া বাহিনী গুলি বন্ধ না করবে না ততদিন আমরা রাজপথ ছাড়ব না।’

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক খুরশীদ আলম বলেন, ‘একাত্তর সালের কালরাতে যে হত্যাযজ্ঞ পাকিস্থান হানাদার বাহিনী চালিয়েছে, আমরা এই প্রজন্ম গত এক সপ্তাহ সেই দৃশ্য দেখেছিলাম। হানাদার বাহিনীর মতো গত ১০ দিন দেশে একই কায়দায় নৃসংসতা চালিয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর যেভাবে গুলি করা হয়েছে, তা কোনো সভ্য সমাজে হতে পারে না। ইসরায়েল যেভাবে গাজায় হামলা করেছিল তার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের তুলনা করা চলে না। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। যতক্ষণ সাংবাদিক হত্যার বিচার ও আসামিদের গ্রেপ্তার করা না হয় ততদিন এই আন্দোলন চলবে।’

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি কবি আব্দুল হাই শিকদার বলেন, ‘গত কয়েকদিন মনে হয়েছিলো আমরা ইসরায়েলি আগ্রাসনের মুখে, আমরা যেন গাজার মধ্যে বাস করছি। পুলিশের গুলিতে যখন মারা হচ্ছিল তখন মনে হয়েছিল ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে বাস করছি। ১৯৭২, ১৯৬২, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে এমন ঘটনা ঘটেনি। রক্তের বদলা কখনও বৃথা যায় না।’

পুলিশকে উদ্দেশ করে তিনি আরও বলেন, ‘২০২৪ সালের গণ আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেছে আবু সাইদ। বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল, পাখির মতো গুলি করে তাকে হত্যা করা হয়। এই যে নির্বিচারে পাখির মতো মারলেন তখন মনে হয়নি আপনারা বাংলাদেশি মানুষ।’

তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের কী অপরাধ? তারা তো আন্দোলনে অংশ নেয়নি, তারা তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েছিল। মেহেদী, তুরাবকে টাগেট করে হত্যা করা হয়েছে। তারা কি কাশ্মীরের মানুষ, তারা কি গাজার মানুষ?’।

 

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘কোটাবিরোধী আন্দোলনের সংবাদ কাভার করতে যাওয়া হাসান মেহেদীকে হত্যা করা হয়েছে। তার অবুঝ দুই সন্তানের দিকে তাকালে বুক ফেটে যায়, আমরা কী জবাব দেব তাদের কাছে? জাতিকে কী জবাব দেবো।’

‘সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নয়াদিগন্তের যে সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, কিছুদিন আগে তার বিয়ে হয়েছে। তার স্ত্রীর হাতের মেহেদীর রং এখনো মুছেনি। সাংবাদিকদের ওপর যে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে, আজকে আমাদের কলম, ক্যামেরা শাণিত না করতে পারলে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত, অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে’ বলেন শহীদুল ইসলাম।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক মহাসচিব এম এ আজিজ বলেন, ‘সাংবাদিকদের জন্য গণতন্ত্র রাখতে হবে। আজ আমরা কথা বলতে গেলে মাইক কেড়ে নেওয়া হয়, মর্গে লাশ পড়ে আছে ছবি দেখানো যায় না। এই সরকারের আমলে এর আগে ৬৪ জন সংবাদিক নিহত হয়েছে। তার সঙ্গে আরও চারজন যোগ হলো। একটি সাংবাদিক হত্যার বিচারও আমরা পাই নাই। এভাবে রাষ্ট্রতন্ত্রকে ছাত্রদের ওপর লেলিয়ে দেওয়া হয়, আগে তা কখনো দেখিনি। এই আন্দোলনে কয়েকটি জিনিস লক্ষণীয়। সেগুলো হলো, ১) সমাজ, সাধারণ জনতা সরকারের পক্ষে নাই। ২) সরকারের সুবিধাভোগী ছাড়া কেউ তাদের জন্য না।’

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চোধুরী বলেন, ‘আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের চারজনকে জীবন দিতে হয়েছে। আমরা যখন বক্তব্য দিচ্ছি শত শত সাংবাদিক হাসপাতালের বিছানায় কাঁতড়াচ্ছে। এদেশের পুলিশ এভাবে গুলি চালাতে পারে তা আমার বিশ্বাস হয় না। আমার মনে হয় ভিনদেশি পুলিশ আমার ভাইদের হত্যা করছে।’

 

বিক্ষোভ সমাবেশে সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধ, গণমাধ্যমের ওপর থেকে সব চাপ তুলে নেওয়া এবং স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়াসহ ১৭ দফা দাবি উপস্থাপন করেন সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ।

Leave A Reply

Your email address will not be published.