বিশেষ প্রতিবেদন | এস.এম.আব্দুর রাজ্জাক:
রাজনীতি কি মানুষের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার হাতিয়ার? নাকি ভিন্ন মতাদর্শের কারণে নিজের জন্মভিটা থেকে বিতাড়িত হওয়াই এখনকার নিয়তি? টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার সরকার বাড়ির সন্তান সুমন সরকার এবং তার পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গত দেড় দশকের ঝড় সেই প্রশ্নই তুলছে।
বিএনপি সমর্থক হওয়ার ‘অপরাধে’ দীর্ঘ ১৬ বছর নিজের বাড়িতে পা রাখতে পারেননি সুমন সরকার। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি হারিয়েছেন তার আপনজনদের— (প্রয়াত) দিদারুল ইসলাম রাঙ্গা, (প্রয়াত) পিতা ও ধনবাড়ী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম, (প্রয়াত) মাতা হাজেরা বেগম এবং মেজ ভাই (প্রয়াত) নাদিম রহমান লুৎফর। বেদনার বিষয় হলো, স্বজনদের দাফন সম্পন্ন করে এক রাত কাটানোর সুযোগও তিনি পাননি। ফজরের নামাজ পড়ে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করার আগেই পুলিশের ভয় দেখিয়ে তাকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। বাড়ির পেছন দিয়ে পালিয়ে বানিয়াজান বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা ছিল তার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
পুরো পরিবার ও গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকলেও সুমন সরকার একাই বিএনপির আদর্শকে আঁকড়ে ধরে ছিলেন। শত বাধা, মামলা-হামলার হুমকি এবং সামাজিক নিপিড়নের মুখেও তিনি দল পরিবর্তন করেননি। এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে দলের বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অভাব বা সঠিক মূল্যায়ন না পেলেও তিনি আদর্শচ্যুত হননি।
সুমন সরকারের হাত ধরেই তার পরিবারে বিএনপির ভিত্তি মজবুত হয়। তিনি তার বড় ভাই রফিকুল ইসলাম লাভলুকে (বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তর ১৮ আসন, খিলক্ষেত থানা তাঁতী দলের সাধারণ সম্পাদক) রাজনীতিতে সক্রিয় করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের মধ্যেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাপন সরকার ও শাকিল সরকার বিএনপিতে যোগদান করেন। বর্তমানে সরকার বাড়ি থেকে সুমন সরকারসহ মোট চারজন বিএনপির সক্রিয় কর্মী হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন।
সুমন সরকারের অনুপস্থিতিতে তার শূন্য বাড়িটি স্থানীয় আওয়ামী মহলের মদদে দখলের চূড়ান্ত পায়তারা করা হয়েছিল। এমনকি ১৭ই ফেব্রুয়ারি শপথ গ্রহণের সময় যখন তিনি এলাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনও বাধা ও ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। সর্বশেষ গত পরশু রাতেও তাকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালানো হয়, যা পরবর্তীতে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়।
দীর্ঘ দেড় দশক পর নিজ জন্মস্থানে ফিরলেও সুমন সরকার এখনও ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে আবদ্ধ। তবে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো ভয়ভীতি বা উচ্ছেদের পরিকল্পনা তাকে দমাতে পারবে না।
সুমন সরকারের ভাষ্য: "অস্তিত্বের প্রশ্নে আমি আপসহীন। গত ১৬ বছরে যা হারিয়েছি তা ফিরে পাব না, কিন্তু নিজের মাটিতে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাব। আমার ওপর হওয়া প্রতিটা নির্যাতনের কথা আমি পর্যায়ক্রমে দেশবাসীকে জানাব।"
উপসংহার: আদর্শের জন্য ঘরবাড়ি ও স্বজন হারানো এই লড়াকু সৈনিক এখন এলাকাবাসীর দোয়া ও সমর্থন প্রত্যাশী। ধনবাড়ীর মাটিতে এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান ঘটবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
মন্তব্য করুন